৯৯তম জন্মবার্ষিকীর শ্রদ্ধাঞ্জলি: মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

১৭ মার্চ ১৯২০। একটি ভোর। বাইগার নদীর তীর ঘেসে ছোট্ট একটি গ্রাম, টুঙ্গিপাড়া। এদিন এ গ্রামে জন্ম নেন এক মহানায়ক। শুধু তাই নয় জন্ম নেয় একটি কিংবদন্তি। যাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি বাঙালির জন্য কাঁদতেন, ভালবাসতেন। বটবৃক্ষ হয়ে ছায়া দিতেন তাঁর জনগণ ও নেতাকর্মীদের। ছিলেন ৭১-এর অনেক পিতৃহীন পরিবারের আশ্রয়। বীরাঙ্গনাদের তিনি দিয়েছিলেন মায়ের মর্যাদা। দিয়েছিলেন পিতৃপরিচয়। আর বাংলার জনগণ ছিলো তাঁর সন্তানের মতো। যাদের সুখ-দুঃখকে নিজের সুখ দুঃখ, জনগণের অধিকার আদায়কে নিজের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ভাবতেন। বিনিময়ে নিজের জীবন দিতেও তিনি সদা প্রস্তুত ছিলেন। এই কারণেই পাকিস্তানিদের শত হুমকি, নির্যাতন তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু বেঁচে ছিলেন মাত্র ৫৪ বছর।
এর মধ্যে ৪৬৭৫ দিন তিনি জেলে কাটিয়েছেন। তিঁনি ফাঁসির মঞ্চ দেখেও ভীত হননি, আপোস করেননি পাকিস্তানী হানাদারদের কাছে।

তিঁনি বাংলার মানুষকে দিয়েছেন একটি ভূখণ্ড, একটি পতাকা, একটি মানচিত্র, বিশ্বের বুকে গর্বিত পরিচয়। স্বাধীন বাংলাদেশকে দিয়েছেন স্বাধীনতা, জাতীয় সঙ্গীত, সংবিধান। তিঁনি শিখিয়েছেন সংগ্রাম, অধিকার আদায়ের দৃঢ়তা। তিঁনি শিখিয়েছেন ন্যায়ের পথে মাথা উঁচু করে বাঁচা, অন্যায়ের কাছে হার না মানা। তাই তো তিঁনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক। ভাগ্য আমাদের ভালো তিনি এই ভূখণ্ডে জন্মেছিলেন। তা না হলে নিপীড়িত জাতি হিসেবে পৃথিবীর কাছে আমরা পরিচিত হতাম। পরাধীনতার গ্লানি ঘুচত না। বঙ্গবন্ধু না থাকলে মাত্র নয় মাসে স্বাধীনতার লাল সূর্যকে ছিনিয়ে আনা সম্ভব হত না।

বঙ্গবন্ধু গবেষকরা মনে করেন, ‘বঙ্গবন্ধু ছিলেন আজীবন লড়াকু একজন মানুষ। শোষকদের রক্তচক্ষু তাঁকে পিছু হটাতে পারেনি। জেল নির্যাতন তাঁকে গণমানুষের অধিকার আদায়ের পথ থেকে টলাতে পারেনি। কেননা তিনি মৃত্যুভয়ে ভীতু ছিলেন না। বরং বাঙালির জন্য জীবনদানে তিনি ছিলেন সদা প্রস্তুত।’ তিনি বলতেন, আমি মানুষ, আমি বাঙালি, আমি মুসলমান। একবার মরে বারবার না। মুসলমান হয়েও কিন্তু অন্য ধর্মের প্রতি, অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি তিনি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। তিঁনি জানতেন ধর্ম যার যার, কিন্তু রাষ্ট্র সবার। একটি ঘটনার উল্লেখ করা যাক। বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। সৌদি বাদশাহ বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, বাংলাদেশের নাম বদলিয়ে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’ রাখলে সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিবে। জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘‘বাংলাদেশের জনগণের প্রায় অধিকাংশই মুসলিম। আমাদের প্রায় এক কোটি অমুসলিমও রয়েছে। সবাই একসঙ্গে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে বা যুদ্ধের রোষানলে পড়েছে। তা ছাড়া সর্বশক্তিমান আল্লাহ শুধুমাত্র মুসলিমদের জন্যই নন। তিনি বিশ্ব ভূখণ্ডের স্রষ্ঠা।  তা ছাড়া আপনার দেশের নামও তো ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব সৌদি আরব’ নয়। আরব বিশ্বের একজন গুণী ও খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ প্রয়াত বাদশাহ ইবনে সৌদের নামে নাম রাখা হয়েছে ‘কিংডম অব সৌদি আরব’। আমরা কেউই এই নামে আপত্তি করিনি।’’ বঙ্গবন্ধু যতদিন বেঁচেছিলেন ততদিন সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বাধীনতা রক্ষা, অধিকার আদায়ে কাজ করে গেছেন। তিনি এ উপমহাদেশে অন্যতম অসাম্প্রদায়িক উদারপন্থি নেতা ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বগুণ এবং জনগণের প্রতি তাঁর ভালোবাসা পৃথিবীবাসী দেখে বিস্মিত হয়েছে। কিউবার কিংবদন্তি নেতা ফিদেল কাস্ত্রো সেকারণে বলেছেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, আমি বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এ মানুষটি হিমালয়ের সমান। সুতরাং আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।’ আমাদের শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন হিমালয়ের চেয়েও বৃহৎ হৃদয়ের অধিকারী। নিউজউইক ম্যাগাজিন বঙ্গবন্ধুকে বলেছিল ‘পোয়েট অব পলিটিকস’। ফিন্যানশিয়াল টাইমস লিখেছে : বঙ্গবন্ধু না থাকলে কখনই বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। টাইম ম্যাগাজিন বঙ্গবন্ধুর ছবি দিয়ে প্রচ্ছদ করেছিল। তাতে লেখা ছিল : ‘বাংলাদেশ : ফ্রম জেল টু পাওয়ার’। দ্য গার্ডিয়ান শেখ মুজিবকে ‘বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে তুলে ধরেছিল। বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানাতে ১৯৭২ সালে সকল প্রটৌকল ভঙ্গ করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্থ হিথ বঙ্গবন্ধুর গাড়ির দরজা খুলে দেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এমন বিস্ময়কর আচরণে অনেকে সমালোচনা করলেও তিনি তাতে কান দেননি।

শেখ মুজিব স্বীকার করতেন তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর জনগণ। বড় দুর্বলতাও তাঁর জনগণ। সব শ্রেণির মানুষকেই তিঁনি আপন করে নিয়েছিলেন। সেই কারণে বাংলাদেশ গঠনের পর বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে সকলেই প্রবেশ করতে পারতো। তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বঙ্গভবনে যেতে বললেও বঙ্গবন্ধু রাজী হননি। ১৫ আগস্টের কালরাতের অনেক আগেই বঙ্গবন্ধুকে ভারত সরকার সতর্ক করে বলেছিল, তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর জনগণকে এতই ভালোবাসতেন যে, তাঁকে কেউ হত্যার ষড়যন্ত্র করতে পারে তিনি বিশ্বাস করেননি। এই বিশ্বাসই তাঁর কাল হয়ে দাঁড়াল। শত্রুরা যাঁকে হত্যা করতে পারেনি, সেই বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করলো বাংলাদেশের কিছু বিপথগামী মানুষ ! সৃষ্টি হল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা তাঁর নাম চিরতরে মুছে দিতে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল। যাঁর নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছিলাম, তাঁর নাম উচ্চারণ করা এদেশে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। সাত মার্চের ভাষণ প্রচার করা বন্ধ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর নেতা-কর্মীদের ওপর চলে হত্যা, নির্যাতন, জেল-জুলুম। কিন্তু ইতিহাস কথা বলে। যেসব কীটেরা ৭৫-এ জাতির জনকের নাম মুছে দিতে চেয়েছে তাদের ঘৃণা জানাই। তারা কি পেরেছে বঙ্গবন্ধুর নাম ও আদর্শকে মুছে দিতে ? না তা পারেনি । কারণ আদর্শকে হত্যা করা যায় না। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু থাকবে। তিনি অজেয় মৃত্যুঞ্জয় মুজিব।
আজকে এই মহানায়কের ৯৯তম জন্মদিন। শুভ জন্মদিন জাতির পিতা। তোমাকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। যদিও ভালোবাসার মানুষের আলাদা করে জন্মদিনের দরকার নেই, প্রতিদিনই তাদের জন্মদিন! সবশেষে বলতে চাই : ‘‘যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা গৌরি বহমান/ততদিন তুমি অমর রবে শেখ মুজিবর রহমান।’’
জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
বাংলাদেশ চিরজীবী হউক।

লেখক : ড. মোহাম্মদ হাসান খান; সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, চাঁদপুর জেলা।